মৃত মানুষের সাথে



গল্পঃ মৃত মানুষের সাথে
লেখাঃ আরমান আলী বাবু

রাতের অন্ধকারে অচেনা এক প্রান্ত থেকে অজানা এক প্রান্তে ভেসে আসা..কিছু সময়ের ব্যবধানে কোথায় যে হারিয়ে গেলাম বুঝতেই পারছিলাম না। চারিদিক অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। যেন মনে হচ্ছিলো আমি মরুভূমির এক অচেনা পথিক।
মনে পড়লো বাংলা সাহিত্যের সেই প্রথম রোমান্টিক উক্তি,
‘পথিক, তুমি পথ হারিয়েছ’।

শহরের হাওয়াতে নিঃশ্বাস নিতে নিতে একঘেয়েমি হয়ে উঠেছিলাম। তাই সব বন্ধুরা মিলে প্লান করলাম কোথাও বেড়াতে যাবো। সবার মতামতের ভিত্তি ছিলো কিছুটা কাল্পনিক মনোরম পরিবেশ। যেখানে প্রাণ ভরে দু’চার মিনিট বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস নেয়া যাবে। 
সাইফ,রুদ্র,মেঘলা,নিলীমা আর আমি। 
সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম আমাদের পুরান বন্ধু দিপালীর বাড়িতে বেড়াতে যাবো। এখন বন্যার সময়। এই সময়ে গেলে হয়তো বন্যাও দেখা হবে, সাথে সাথে একঘেয়েমিটাও কেটে যাবে সবার। 

শহরের পরিবেশে বেড়ে উঠা আমাদের প্রত্যেকের জীবন।
শহরের আশেপাশে যে অন্যরকম জীবন আছে তা আমরা জানি না। গ্রামের জীবন যে কতই আলোকিত তা আমরা কেউই বুঝি না। শুধু পাঠ্যবইয়ে পড়ি, 
”আমাদের ছোটনদী চলে বাঁকে-বাঁকে”।
দিপালীর সাথে আমার বন্ধুত্ব বেশিদিনের না হলেও খুব জোড়ালো একটা সম্পর্ক। শহরে ভার্সিটির এডমিশন কোচিং এর সময় পরিচয়। সেই থেকে বারবার দিপালী গ্রামে যেতে বললেও সময় হয়ে উঠেনি কখনো। 

শুক্রবারের দিন বাসা থেকে বেড়িয়ে সবাই বাইক নিয়ে রওনা দিলাম দিপালীদের গ্রামে। সাইফের সাথে মেঘলা আর রুদ্রর সাথে নিলীমা। আর আমি ছোট মানুষ, একা। 
বাইকের উপর থেকে গাইতে আরম্ভ করলাম
‘নীল আকাশের নিচে আমি রাস্তা চলেছি একা।’
নীলশহর থেকে দিপালীদের গ্রামে পৌঁছাতে দু’ঘন্টা মতো সময় লেগে যায়। তবে আমাদের বেশিই লাগার কথা। কারণ আমরা নতুন এক পথের পথিক। 
চলছি আমরা রাজপথ দিয়ে।

দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে সন্ধ্যা নামার আগেই পৌঁছে গেলাম দিপালীদের গ্রামে। গ্রামে প্রবেশের মূহুর্তেই যেন ঘ্রাণ ভেসে আসছিলো শান্ত একটা গ্রামীণ পরিবেশের। নেই কোনো কলরব, নেই কোনো হিংসা-বিদ্বেষ।
এই প্রথম দিপালীদের বাড়ি যাচ্ছি তাই খালি হাতে গেলে তো আর হচ্ছে না। সেজন্য বগুড়ার দই সাথে নিয়েছি গোটাকয়েক। 

কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক খুঁজাখুঁজি করার পর অবশেষে দিপালীদের বাড়ির সন্ধান পেলাম। মজার বিষয় এটায়
যে বাড়িটি দিপালীদের ও বাড়িতেই আমরা খোঁজ নিচ্ছিলাম দিপালীর বাবার নাম ধরে যে তার বাড়ি কই।
আসলে এতোবড় প্রাসাদের মত বিশালাকার বাড়ি হবে ওদের তাও আবার গ্রামে এটা কখনো কল্পনাও করিনি।
যাক সেকথা। সময় এশার ওয়াক্ত হবে দিপালীদের বাড়িতে পৌঁছালাম তাই আর আড্ডার আসর না দিয়ে সবাই ঘুমাতে গেলাম। দিপালীর সাথে অনেকদিন পর দেখা তাই দিপালী হাসছিলো আমিও মুচকি হাসছিলাম।

ফজরের আযান দিচ্ছেন মুয়াজ্জিন সাহেব। কান ভারী না করে সবাই উঠে ফ্রেশ হয়ে আগে নামায আদায় করলাম। আমরা মানুষ খারাপ হতে পারি কিন্তু স্রষ্টার সাথে নাফরমানী করতে খুবই ভয় পাই। 
সূর্য উঠা সকালের প্রাণবন্ত এক মধুর লগ্নে দাঁড়িয়ে আছি গ্রামের এক কোণে। যেখান থেকে নদী দেখা যায়। 
শহরের ছেলেমেয়ে নদী দেখতে খুব পছন্দ করে কিন্তু গ্রামের ছেলেমেয়ে তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। 

সকালে নাস্তা রেডি হয়ে গেছে জানিয়ে দিলেন দিপালীর মা। আমরা সবাই খাবার টেবিলে বসে খাবার খাচ্ছিলাম হঠাৎ সাইফ বলে উঠলো আজ আমরা নদীতে সাঁতার কাটতে যাবো।সবাই নিজেদের মতামত দিলো এবং সবাই রাজিও হয়ে গেলো। 
আমি নিরুপায়। আমার নদী ভালো লাগে কিন্তু সাঁতার কাটতে না,কারণ আমি সাঁতার পারি না।
অবশেষে দিপালীর কথায় রাজি হয়ে গেলাম।
আমরা আলাপ করছিলাম কখন যাওয়া যায়।
হঠাৎ দিপালীর মা নিষেধ করলেন যেনো আমরা নদীতে না যাই। কারণ নদীর পানি আর বন্যার পানি এখন এক হয়ে গেছে, কখন যে পানি বেড়ে যাবে কে জানে। 
বিপদ হতে পারে বিপদ।
তিনি আরো বললেন,’কালো পানি খুব মারাত্মক বিপদের নমুনা,সবাই মাথায় রেখো’।

মাঝদুপুর গড়িয়ে বিকেলের ছায়া পড়ছিলো। আজ খুব বৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু কে শুনে কার কথা! আমরা সবাই রেডি হলাম নদীতে যাওয়ার জন্য। বৃষ্টির পানিতে ভিজবো আর বন্যার পানিতে ভেসে ভেসে পুরো নদী দেখবো।
সবাই মিলে মজা করবো এটাই আমাদের ইচ্ছা।
বৃষ্টি একটু কম পড়তে শুরু করলে আমরা সবাই রওনা হলাম নদীর দিকে। গ্রামের পরিবেশে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সাঁতার কাটা খুব আনন্দের। আমরা শুধু একা আসিনি, আমাদের সাথে গ্রামের অনেক অপরিচিত লোকজনকেও দেখতে পেলাম। খুব আনন্দমুখর একটা পরিবেশ। 

হঠাৎ
স্বপ্নের মতো আবহাওয়ার যেনো পরিবর্তন এসে গেলো। আকাশের মেঘ কালো হয়ে উঠলো। বাতাসে সাথে সাথে প্রচন্ড বৃষ্টি। তারপরেও কয়েকমিনিট পরপরই বাজ পড়তে শুরু করলো। দুমিনিট আগের আনন্দমুখর পরিবেশ কিছু না বুঝার আগেই শেষ হয়ে গেলো।
আমরা এমন একটা জায়গায় অবস্থান করছিলাম যে জায়গা থেকে লোকালয় অনেকটা দূরে।
নদীর কাছাকাছি অবস্থান করায় বিপদ আরো বেড়েই চলছিলো। এগুলা দেখতে দেখতেই কিছুক্ষণের মাঝে নদীর পানি যেন ফুলে উঠতে শুরু করলো।
মূহুর্তেই আমাদের সবাইকে ডুবিয়ে দিলো দ্বৈতময়ী সেই নদী।

সেই অন্ধকারের কালো ছায়া পেঁড়িয়ে কোথা হতে কোথায় যে গেলাম তা আমার ধারণার বাহিরে। 
কিছুক্ষণ বেঁহুশে থাকার পর যখন হুশে ফিরলাম তখনো অন্ধকারময় ছিলো। আকাশে তারার আগুন দেখে বুঝতে পারলাম রাত নেমে এসেছে। অজানা একপ্রান্তরে আমি কোথায় আছি এটায় প্রশ্নবিদ্ধ করছিলো আমাকে। 
আশেপাশে হাত বুলিয়ে বুঝলাম আমি একা নয় আমার সাথে আরো অনেকে আছে এই মরুর দেশে।
শান্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলে তাদের দলে আমিও চলে গেলাম। সকালের অপেক্ষায় ঘুমিয়ে গেলাম তাদের মতো।

কুকুরের ঘেউঘেউ শব্দ শুনে বুঝতে পারলাম সকাল হয়ে গেছে। চোখ দুটো খুলে আলতোভাবে বসে পড়লাম সেখানেই। 
হঠাৎ গতরাতের সেই মানুষগুলোর কথা মনে পড়লো।
আবার আশেপাশের সেই মানুষগুলোর দেহে হাত বুলাতে লাগলাম। আমার পাশে তেমন কোনো পরিচিত লোকজনকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। মরুময় এই দেশে এক অপরিচিত জনকে ডাকতে লাগলাম কিন্তু তিনি চোখ খুললেন না। এরপর আরেকজনকে ডাক দিলাম। তিনিও আমার ডাকে সাড়া দিলেন না। এভাবে আশেপাশের প্রায় বারোজনকে ডাক দিলাম কিন্তু কেউ সাড়া দিচ্ছিলো না। কিছুক্ষণের মাঝে আমার ভিতরে ভয় কাজ করা শুরু করলো। যে মানুষ কথা বলেনা, যে মানুষগুলো ডাকে সাড়া দিচ্ছেনা তারা আসলেও কি এখনো জীবিত? মনে প্রশ্নের সংশয় হলো। ফিরে গেলাম আবার গতরাতে। 
তাহলে কি আমি সারারাত মরা মানুষগুলোর সাথে ছিলাম?

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*